মানব পাচার প্রতিরোধ, পাচার থেকে উদ্ধারপ্রাপ্ত নারী-পুরুষের টেকসই পুনর্বাসন এবং তাদের জন্য বিদ্যমান সেবা ও সহায়তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নরসিংদীতে সচেতনতামূলক অংশীজন সমন্বয় কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়েছে।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকালে নরসিংদীর অরবিট রেস্টুরেন্টের হলরুমে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়।
Warbe Development Foundation-এর আয়োজনে, সুইজারল্যান্ড দূতাবাসের অর্থায়নে এবং Winrock International-এর সহযোগিতায় ‘আশ্বাস’ প্রকল্পের আওতায় কর্মশালাটির আয়োজন করা হয়। এতে প্রকল্পটির ব্যবস্থাপক মো. আতাউর রহমান সরকার ও কেস ম্যানেজার-সোশ্যাল সার্ভিস রিয়েনা হক নিঝু সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন।
কর্মশালায় সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, মানব পাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা, সারভাইভার প্রতিনিধি ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের মোট ২০ জন প্রতিনিধি অংশ নেন।
কর্মশালায় মানব পাচার প্রতিরোধ এবং পাচার থেকে উদ্ধারপ্রাপ্তদের পুনর্বাসনে মনোসামাজিক সহায়তা, কাউন্সেলিং, স্বাস্থ্যসেবা, আইনগত সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন ও রেফারেল সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ সময় সারভাইভারদের প্রয়োজনভিত্তিক ও সমন্বিত সেবা প্রদানে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় জোরদারের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।
আলোচনায় বক্তারা বলেন, মানব পাচার থেকে উদ্ধারপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের টেকসই পুনর্বাসনে শুধু প্রকল্পভিত্তিক কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। এ ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে শক্তিশালী রেফারেল ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
কর্মশালায় নরসিংদী জেলা যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক সুব্রত কর জানান, মানব পাচারের শিকার ব্যক্তিরা প্রয়োজন অনুযায়ী বিভিন্ন প্রশিক্ষণে অংশ নিতে চাইলে তাদের প্রশিক্ষণের সুযোগ নিশ্চিত করতে সহযোগিতা করা হবে। এ ছাড়া আশ্বাস প্রকল্পের আওতায় পোল্ট্রি খামারের সঙ্গে যুক্ত সারভাইভারদের জন্য বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট স্থাপনের সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতা করা হবে। এতে জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। কাউন্সেলিং কর্নারের কার্যক্রম ও সেবা সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে কাউন্সেলিং ও মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সেশন অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
শিপলো স্পিনিং মিলসের এইচআর ম্যানেজার প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী দক্ষ চারজন সারভাইভারকে ইলেকট্রিশিয়ান পদে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে সহযোগিতার আশ্বাস দেন।
জেলা কর্মসংস্থান ও জনশক্তি অফিসের (ডিইএমও) ম্যানপাওয়ার সার্ভে অফিসার হারুনুর রশিদ সিকদার জানান, মানব পাচারের শিকার হয়ে দেশে ফিরে আসা ব্যক্তিদের ক্ষতিপূরণ প্রাপ্তির ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয় করা হবে। পাশাপাশি প্রি-ডিপারচার ওরিয়েন্টেশন (পিডিও) ক্লাসে কাউন্সেলিং কর্নারের কার্যক্রম এবং মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতামূলক সেশন পরিচালনার সুযোগ তৈরিতেও সহযোগিতা করা হবে।
কর্মসংস্থান ব্যাংকের ব্যবস্থাপক পিয়ারুল হাসান আশ্বাস প্রকল্পের কার্যক্রমের প্রশংসা করেন। তিনি প্রকল্পের সারভাইভার ও সম্ভাবনাময় উদ্যোক্তাদের ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণসুবিধা গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন। একই সঙ্গে ঋণপ্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং তাদের অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার সুযোগ সৃষ্টির ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
কর্মশালায় কাউন্সেলিং কর্নারের কার্যক্রমের স্থায়িত্ব, সারভাইভার লিডারদের ভূমিকা, উইমেন এন্টারপ্রেনারশিপ নেটওয়ার্কের (ডব্লিউইএন) মাধ্যমে নারী সারভাইভারদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, কর্মসংস্থানের পর নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া এবং চাকরিতে স্থায়িত্ব নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।
এ ছাড়া আশ্বাস প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও মানব পাচারের শিকার নারী ও পুরুষদের জন্য সেবা ও সহায়তা অব্যাহত রাখতে সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়ে একটি সমন্বিত ইউনিট বা প্ল্যাটফর্ম গঠনের প্রস্তাব করা হয়। এর মাধ্যমে প্রকল্প-পরবর্তী সময়েও কাউন্সেলিং, স্বাস্থ্যসেবা, আইনগত সহায়তা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, উদ্যোক্তা উন্নয়ন, আর্থিক সহায়তা ও রেফারেল সেবা অব্যাহত রাখার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এ সময় নরসিংদী জজ কোর্টের লিগ্যাল এইডের আইনজীবী শিরিন সুলতানা মৌ, গ্রাম আদালতের কো-অর্ডিনেটর মনি আক্তার, রায়পুরা প্রবাসবন্ধু ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এসএম শরীফ মিয়া, নারী উদ্যোক্তা সালমাসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
কর্মশালায় অংশগ্রহণকারীরা মানব পাচার প্রতিরোধ, সারভাইভারদের অধিকার ও সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং তাদের টেকসই পুনর্বাসনে নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে সহযোগিতা অব্যাহত রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।