বাংলাদেশে এখন শিক্ষার বিস্তার দৃশ্যমান, কিন্তু তার গভীরতা নিয়ে ক্রমেই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে। প্রতি বছর এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষায় হাজার হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পাচ্ছে, নতুন নতুন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠছে, কিন্তু একই সময়ে চাকরির বাজারে শোনা যাচ্ছে এক অদ্ভুত অভিযোগ—‘যোগ্য প্রার্থী পাওয়া যাচ্ছে না।’ এই বৈপরীত্যই আজকের বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার সবচেয়ে নির্মম বাস্তবতা।
আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষার আধুনিকায়নের কথা বলে আসছি। কিন্তু বাস্তবে আধুনিকায়ন অনেকটাই সীমাবদ্ধ থেকেছে প্রযুক্তি ব্যবহারে। শ্রেণিকক্ষে প্রজেক্টর এসেছে, অনলাইন ক্লাস চালু হয়েছে, কিন্তু শিক্ষার মূল কাঠামো অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। এখনো একজন শিক্ষার্থীকে শেখানো হয় কীভাবে পরীক্ষায় ভালো করতে হয়, কিন্তু শেখানো হয় না কীভাবে চিন্তা করতে হয়, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, কিংবা কীভাবে বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান করতে হয়। ফলে ১২-১৫ বছর পড়াশোনা শেষে একজন তরুণ যখন বাস্তব জীবনে প্রবেশ করে, তখন সে বুঝতে পারে—তার শেখা জ্ঞানের বড় একটি অংশ প্রয়োগ করার মতো নয়। এই শূন্যতার মধ্যেই তৈরি হচ্ছে দিকহীনতা।
আজকের তরুণ প্রজন্মের একটি অংশ যে উদ্বেগজনক ভাবে মাদক ও অসুস্থ বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে, তা হঠাৎ করে তৈরি হয়নি। এটি দীর্ঘদিনের অনুপ্রেরণাহীন শিক্ষা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের ফল। ঢাকার অলিগলি থেকে শুরু করে জেলা শহর, এমনকি গ্রাম পর্যন্ত—মাদকের বিস্তার এখন আর অস্বীকার করার মতো নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে প্রায়ই দেখা যায়, ধরা পড়া অনেকেই শিক্ষার্থী বা সদ্য শিক্ষাজীবন শেষ করা তরুণ। যে বয়সে তাদের গবেষণাগারে, লাইব্রেরিতে বা উদ্ভাবনের কাজে ব্যস্ত থাকার কথা, সেই বয়সেই তারা ভুল পথে পা বাড়াচ্ছে। কারণ শিক্ষা তাদের কাছে স্বপ্ন নয়, বরং একটি চাপ।
এক সময় গ্রামের সন্ধ্যা মানেই ছিল পড়াশোনার পরিবেশ। মাগরিবের আজানের পর কুপির আলোয় কিংবা বৈদ্যুতিক বাতির নিচে বই নিয়ে বসত শিশু-কিশোররা। আজ সেই দৃশ্য অনেকটাই বদলে গেছে। স্মার্টফোনের আলো কুপির আলোকে গ্রাস করেছে, কিন্তু সেই আলো জ্ঞানের নয়—বিনোদনের। অনেক গ্রামে এখনো মানসম্মত শিক্ষক নেই, নেই পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী। ফলে পড়াশোনা একটি আনন্দদায়ক অভ্যাস না হয়ে দায়িত্বে পরিণত হয়েছে। শহরের শিক্ষার্থীরা যেখানে কোচিং, ইন্টারনেট ও বিভিন্ন সুযোগ পাচ্ছে, সেখানে গ্রামীণ শিক্ষার্থীরা পিছিয়ে পড়ছে—এই বৈষম্য ভবিষ্যতে আরও বড় সংকট তৈরি করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও এই সংকট থেকে মুক্ত নয়। দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে, কিন্তু গবেষণার সংস্কৃতি সেই অনুপাতে গড়ে ওঠেনি। অধিকাংশ শিক্ষার্থী ডিগ্রিকেই চূড়ান্ত লক্ষ্য হিসেবে দেখে। অনেক ক্ষেত্রে ল্যাব সুবিধার সীমাবদ্ধতা, গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়নের অভাব এবং একাডেমিক পরিবেশের বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা শিক্ষার্থীদের গবেষণায় আগ্রহী হতে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে আমরা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে পারছি না, যারা নতুন কিছু আবিষ্কার করবে বা বিশ্বমানের উদ্ভাবনে অবদান রাখবে।
এই বাস্তবতার আরেকটি স্পষ্ট প্রতিফলন দেখা যায় বিমানবন্দরে। প্রতি বছর হাজার হাজার শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যাচ্ছে। অনেকেই আর ফিরে আসে না। কারণ তারা বিশ্বাস করে, তাদের মেধার যথাযথ মূল্যায়ন ও প্রয়োগের সুযোগ দেশে সীমিত। এটি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি সামষ্টিক আস্থাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। আমরা মেধা তৈরি করছি, কিন্তু সেই মেধাকে ধরে রাখার মতো পরিবেশ তৈরি করতে পারছি না।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার উদ্দেশ্য নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি। বাংলাদেশে শিক্ষা প্রায় সমার্থক হয়ে গেছে চাকরির সাথে। পরিবার, সমাজ—সবখানেই একটি চাপ কাজ করে: “ভালো করে পড়াশোনা করো, একটি ভালো চাকরি পেতে হবে।” ফলে একজন শিক্ষার্থী শুরু থেকেই নিজেকে একজন চাকরিপ্রার্থী হিসেবে গড়ে তোলে, সৃষ্টিশীল মানুষ হিসেবে নয়। বাস্তবতা হলো, প্রতি বছর বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী চাকরির বাজারে প্রবেশ করছে, কিন্তু সেই অনুপাতে কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। ফলে হতাশা বাড়ছে, প্রতিযোগিতা অসুস্থ হয়ে উঠছে, এবং অনেকেই জীবনের লক্ষ্য হারিয়ে ফেলছে। অন্যদিকে, আমাদের দেশের অপার সম্ভাবনাগুলো রয়ে যাচ্ছে অনাবিষ্কৃত। বঙ্গোপসাগরের বিশাল সমুদ্রসম্পদ, কৃষির বৈচিত্র্য, খনিজ সম্পদের সম্ভাবনা—সবই আমাদের সামনে উন্মুক্ত। কিন্তু এই খাতগুলোতে কাজ করার মতো দক্ষ জনবল আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। দেশে এখনো মেরিন সায়েন্স, অ্যারোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং, কিংবা আধুনিক রেলওয়ে প্রযুক্তিতে দক্ষতার ঘাটতি স্পষ্ট। ফলে বড় বড় প্রকল্প বাস্তবায়নে আমরা বিদেশি বিশেষজ্ঞের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ি। স্বাধীনতার এত বছর পরও এটি আমাদের জন্য একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা।
এই অবস্থার জন্য দায় শুধুমাত্র শিক্ষার্থীদের নয়; নীতিনির্ধারণের দীর্ঘদিনের দুর্বলতাও এর জন্য দায়ী। বিশ্বশিক্ষা ব্যবস্থার সাথে তাল মিলিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা আমরা তৈরি করতে পারিনি। শিক্ষাকে আনন্দদায়ক, গবেষণামুখী ও বাস্তবমুখী করার পরিবর্তে আমরা একে পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও সনদনির্ভর করে তুলেছি।
তবুও আশার জায়গা আছে। বাংলাদেশের তরুণদের মেধা ও উদ্যম নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। প্রয়োজন সঠিক দিকনির্দেশনা ও পরিবেশ। শিক্ষাকে যদি মুখস্থনির্ভরতা থেকে বের করে বাস্তবমুখী করা যায়, গবেষণায় যদি বিনিয়োগ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যায়, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্পখাতের মধ্যে যদি কার্যকর সংযোগ তৈরি করা যায়, এবং তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য যদি বাস্তব সহায়তা দেওয়া যায়—তাহলে এই চিত্র বদলানো অসম্ভব নয়।
সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আনতে হবে আমাদের মানসিকতায়। শিক্ষাকে শুধু চাকরি পাওয়ার মাধ্যম হিসেবে নয়, জীবন গড়ার ভিত্তি হিসেবে দেখতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যেন বুঝতে পারে—তার লক্ষ্য শুধু একটি চাকরি নয়, বরং একটি সমস্যা সমাধান করা, নতুন কিছু সৃষ্টি করা, দেশকে এগিয়ে নেওয়া।
বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে সনদনির্ভর, দক্ষতাহীন একটি প্রজন্ম; অন্যদিকে সম্ভাবনাময়, উদ্ভাবনী একটি ভবিষ্যৎ। আমরা কোন পথে যাব, সেই সিদ্ধান্ত এখনই নিতে হবে। কারণ শিক্ষা যেমন, ভবিষ্যৎও তেমনই হবে।
লেখক: মোঃ আরিফ পাঠান
প্রতিষ্ঠাতা ও অধ্যক্ষ
পলাশ রেসিডেন্সিয়াল মডেল স্কুল এন্ড কলেজ।