মাত্র ৯ বছরের শিশু তুলি। তার ছোট্ট পৃথিবীর সবচেয়ে বড় চিন্তা ছিল শতবর্ষী দাদির কষ্ট। বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, চোখে আলো নেই, হাঁটার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন দিদি। তাই শিশুমনের সরল ভাষায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে তার একটাই আবেদন—‘আমার দিদির জন্য একটা গাড়ি দেন।’
তুলির কাছে ‘গাড়ি’ মানেই ছিল একটি হুইলচেয়ার। আর সেই নিষ্পাপ আবদারই ছুঁয়ে যায় নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাসুদ রানার হৃদয়।
সোমবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যায় তুলি। সঙ্গে ছিল তার ফুফাতো ভাই কৃষ্ণ। দুই শিশুকে দেখে কাছে ডেকে নেন ইউএনও। কথা বলতে বলতেই তুলি জানায়, তার দিদির চলাফেরা করতে খুব কষ্ট হয়। তাই দাদির জন্য একটি ‘গাড়ি’ চায় সে।
শিশুটির কথায় আবেগাপ্লুত হয়ে ইউএনও তাৎক্ষণিকভাবে তুলির শতবর্ষী দাদির জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করেন। শুধু তাই নয়, দরিদ্র দুই শিশুর অবস্থা দেখে তাদের জন্য নতুন জামাকাপড়ও কিনে দেন। নতুন পোশাক হাতে পেয়ে তুলি ও কৃষ্ণের মুখে ফুটে ওঠে নির্মল হাসি।
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তার অফিসিয়াল ফেসবুক আইডি (Uno Raipura Narsingdi) থেকে শিশু তুলির ঘটনা শেয়ার করেন। এতে সাড়ে তিন হাজার লাইক পড়েছে। তার এই মানবিক কাজের প্রশংসা করে পোস্টে মন্তব্য করেছেন কয়েকশো মানুষ।
সুমন সালাউদ্দিন নামে এক ব্যক্তি লিখেন, ‘বাহ , এ যেন স্বপ্নের বাংলাদেশ! Keep up the good work, brother.’
রায়পুরা পশ্চিম থানা জামায়াতের আমীর মাওলানা আদিল ভূইয়া লিখেন, ‘খুবই ভালো লাগলো। উপজেলা প্রশাসনের প্রসংসনীয় এমন মানব সেবা হউক সার্বজনীন।’
মাসুম পারভেজ নামে একজন লিখেন, ‘তুলির সেই মায়াভরা হাসি আর আপনার এই মানবিক হৃদয়—দুটোই আজীবনের এক অনন্য প্রাপ্তি হয়ে থাকবে। সরকারি পদের উর্ধ্বে উঠে একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে যেভাবে সাধারণ মানুষের পাশে দাঁড়ালেন, তার কৃতজ্ঞতা জানিয়ে শেষ করা যাবে না। তুলিদের জীবন এভাবে ভালোবাসা আর নতুন আলোয় ভরে উঠুক।’
জানা গেছে, তুলির মা নেই। বাবা নিরঞ্জন পেশায় একজন জেলে। দুই সন্তানকে নিয়ে রায়পুরা পৌরসভার হরিপুর এলাকায় একটি ভাড়া বাসায় বসবাস করেন তিনি। সংসারের সবচেয়ে বয়স্ক সদস্য তুলির শতবর্ষী দাদি। বার্ধক্য ও অসুস্থতায় তিনি প্রায় চলাফেরা করতে পারেন না।
স্থানীয়দের কাছ থেকে তুলি শুনেছিল, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে হুইলচেয়ার পাওয়া যায়। সেই বিশ্বাস থেকেই দাদির কষ্ট লাঘবের আশায় সে ছুটে যায় ইউএনওর কাছে। তার সঙ্গে ছিল ফুফাতো ভাই কৃষ্ণ, যার গায়েও তখন কোনো জামাকাপড় ছিল না।
রায়পুরা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মো. মাসুদ রানা বলেন, ‘তাদের দাদি বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন এবং শারীরিকভাবে অসুস্থ। বিষয়টি জানার পরপরই তার চলাচলের জন্য একটি হুইলচেয়ারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পাশাপাশি শিশু দুটির জন্য নতুন জামাকাপড়ও কিনে দেওয়া হয়েছে।’
পরে উপজেলা প্রশাসনের কর্মচারীরা রিকশাযোগে তুলি, কৃষ্ণ এবং হুইলচেয়ারটি তাদের হরিপুরের বাসায় পৌঁছে দেন।