নরসিংদীর মাধবদীতে ২২ নভেম্বর শুক্রবার যে ৫.৭ মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে, তা শুধু কয়েক সেকেন্ডের কম্পন নয়—এটি বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি ভূমিকম্প ঝুঁকির এক ভয়ংকর সংকেত। মাটির মাত্র ১০ কিলোমিটার গভীরে উৎপত্তি হওয়া এই ভূমিকম্পে ঢাকাসহ সারাদেশ কেঁপে ওঠে, এখন পর্যন্ত প্রাণহানি হয়েছে অন্তত ১০ জনের এবং আহত হয়েছেন ৫০০–রও বেশি মানুষ। এর পরদিন আবার পলাশ উপজেলায় ৩.৩ মাত্রার আরেকটি কম্পন বিশেষজ্ঞদের আরও শঙ্কিত করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাধবদী বাংলাদেশের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ একটি ফল্ট লাইনের ওপর অবস্থিত, যেখানে ইন্ডিয়ান প্লেট ধীরে ধীরে বার্মিজ প্লেটের নিচে ঢুকে যাচ্ছে। এই অবস্থানগত পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যে শক্তি জমছে, তার বয়স প্রায় ৮০০ বছর। ভূমিকম্প বিশেষজ্ঞ ও ঢাবির ভূ-তত্ত্ব বিভাগের সাবেক অধ্যাপক সৈয়দ হুমায়ুন আখতার বিবিসিকে জানান, এই অঞ্চলে ৮.২ থেকে ৯ মাত্রার ভূমিকম্প সৃষ্টির মতো বিপুল শক্তি সঞ্চিত রয়েছে।
তার ভাষায়, ‘মাধবদীতে শুক্রবার যে কম্পন হয়েছে, সেটি মূল শক্তির খুব সামান্য অংশের মুক্তি। এর মানে দাঁড়ায়, বড় ভূমিকম্পের রাস্তা আরও সহজ হয়ে গেল। সামনে বড় বিপর্যয় হতে পারে।’
বাংলাদেশ তিন দিক থেকে তিনটি বড় প্লেটের চাপে রয়েছে—পশ্চিমে ইন্ডিয়ান প্লেট, পূর্বে বার্মা প্লেট, উত্তরে ইউরেশিয়ান প্লেট।
এই প্লেটগুলো একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খাওয়ায় দেশের পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব অংশে বিভিন্ন সক্রিয় ফল্ট তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে ডাউকি ফল্ট, সিলেট-চট্টগ্রাম-টেকনাফ সাবডাকশন জোন সবচেয়ে ভয়ংকর। মাধবদীর উৎপত্তিস্থল এই ভয়ংকর সাবডাকশন সেগমেন্টের মধ্যেই পড়ে।
ইউএসজিএস জানায়, ১৯৫০ সালের পর এ অঞ্চলে ৫.৫ বা তার বেশি মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছে অন্তত ১৪টি। ইতিহাসও বলছে, এ অঞ্চলের ভূকম্পন শক্তি নদীর গতিপথ বদলে দেওয়ার মতো প্রবল ছিল—১৭৯৭ সালের ভূমিকম্পে ব্রহ্মপুত্র তার পথ পরিবর্তন করে, ১৭৬২ সালের ভূমিকম্পে সেন্টমার্টিন দ্বীপ তিন মিটার ওপর উঠে আসে।
মাধবদীর সাম্প্রতিক কম্পন বিশেষজ্ঞদের মনে করিয়ে দিয়েছে, জমে থাকা শক্তি আর বেশিদিন আটকে রাখা সম্ভব না। অধ্যাপক হুমায়ুন আখতার বলেন, ‘এই শক্তি একসময় বের হবেই। যদি তা এক ঝটকায় বের হয়, তাহলে ঢাকা নগরী মৃত্যুপুরীতে পরিণত হতে পারে।’
বিশেষজ্ঞদের সুপারিশ—এই মুহূর্তেই ভবন নিরাপত্তা যাচাই, জরুরি প্রস্তুতি, এবং ভূমিকম্প পূর্বাভাস ও পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বিনিয়োগ প্রয়োজন। কারণ, মাধবদীর কম্পন হয়তো বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্ক বার্তা—যা বড় ভূমিকম্পের আগাম সংকেতও হতে পারে।