মেঘনা নদীতে ৪২ কিমি. সাঁতরেছেন পল্লী চিকিৎসক বকুল

আগের সংবাদ

মাধবদীতে বালুবাহী-যাত্রীবাহী ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত ২, আহত ১২

পরের সংবাদ

কৃষি অর্থনৈতিক বিপ্লব

নরসিংদীতে লটকনে ১৬৮ কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা

সুজন বর্মণ, নরসিংদী

প্রকাশিত: আগস্ট ৩, ২০২১ , ১১:২৬ অপরাহ্ণ

এক সময়ের কদরহীন লটকন এখন বর্ষা মৌসুমের অন্যতম জনপ্রিয় ফল। লটকনের জন্য বিখ্যাত নরসিংদী জেলার বাগানগুলো এখন লটকনে লটকনময়। এই জেলার উৎপাদিত লটকন আকারে বড়, দেখতে হলদে মসৃন আর স্বাদে সুমিষ্ট হওয়ায় দেশবাসীর পাশাপাশি বিদেশীদের হৃদয় কেড়ে নিয়েছে।

চলতি মৌসুমে ১৬৮ কোটি টাকার লটকন বাণিজ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। তবে, এবার অনাবৃষ্টিতে লটকনের ফলন হয়েছে কম। এদিকে করোনা পরিস্থিতিতে অনেকটা পাল্টে গেছে এই চিত্র। বাগান মালিকরা কিছুটা লাভবান হলেও বিভিন্ন যানবাহন ও রপ্তানী বন্ধ থাকায় দুই বছর ধরে লোকসান গুনছেন লটকন ব্যবসায়ীরা।

উচু আর লালমাটির টিলা লটকন চাষের জন্য উপযোগী ভূমি। জেলার সর্বত্র কমবেশি লটকনের ফলন হয়। এই বছর জেলায় ১ হাজার ৬ শত ১০ হেক্টর জমিতে লটকনের আবাদ হয়েছে। লটকনের স্বাদ অম্লমধুর এবং পুষ্টিমান প্রচুর। ঔষধী গুণ সম্পন্ন সুস্বাধু লটকন ডায়াবেটিকস্, প্রেসার নিয়ন্ত্রণ সহ রুচি বর্ধক ফল হিসেবে জনপ্রিয়তা পাওয়ায় এর চাহিদা বেড়েছে কয়েক গুণ। প্রচুর পুষ্টিগুনে ভরপুর লটকন আবাদ করে স্বাবলম্বী নরসিংদীর শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার অনেক কৃষক। ইতিমধ্যে এসব এলাকার মানুষের কাছে লটকন এখন অন্যতম অর্থকরী ফসল হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

ব্যাপক ফলন লটকনের

এছাড়া অন্যান্য ফসলের তুলনায় কয়েকগুন লাভ বেশী হওয়ায় লটকন চাষে ঝুঁকে পড়ছে কৃষকরা।তবে এবছর অনাবৃষ্টি আর খড়ার কারণে লটকনের ফলন কম হয়েছে। বাজারে আকারভেদে প্রতি কেজি লটকন বিক্রি হচ্ছে ৭০ টাকা থেকে ১২০ টাকা পর্যন্ত।

নরসিংদী জেলা কৃষি অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার লাল মাটিতে প্রচুর পরিমাণ ক্যালসিয়াম ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান, তাই এখানে লটকনের ভালো ফলন হয়। চলতি মৌসুমে ১ হাজার ৬শত ১০ হেক্টর জমিতে লটনকনের বাগান করা হয়েছে। যা হেক্টর প্রতি ১৫ টন হারে ২৪ হাজার মেট্রিক টন লটকনের ফলন পাওয়া যাবে বলে আশাবাদী কৃষি বিভাগ। আর উৎপাদিত এ লটকন পাইকারি ৭০ টাকা কেজিতে বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। যার মূল্য পাওয়া যাবে প্রায় ১৬৮ কোটি টাকা।

বাণিজ্যিক চাষ ছাড়াও বিক্ষিপ্তভাবে বিভিন্ন ঘরবাড়ি ও পতিত জমিতেও লটকন গাছ রয়েছে যা কৃষি বিভাগের হিসাবের অর্ন্তভুক্ত নয়।

বিক্রির জন্য বাট কোন সংগ্রহ করছেন চাষিরা

নরসিংদীর পাশাপাশি সিলেট, নেত্রকোনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাজিপুর জেলায়ও লটকনের চাষ হচ্ছে। অঞ্চলভিত্তিক এর বেশ কিছু স্থানীয় নাম রয়েছে। চট্রগামে এর নাম হাড়ফাটা, সিলেটবাসী চেনে ডুবি নামে, ময়মনসিংহে বলে কানাইজু। আঙ্গুরের মতো খোকায় খোকায় ধরে বলে ইংরেজিতে এর নাম Burmese grap। বৈজ্ঞানিক নাম Baccaurea sapida ।

নরসিংদীর শিবপুর, বেলাব ও রায়পুরা উপজেলার বিশাল অঞ্চল লাল মাটির টিলাময়। গ্রামের ভিতরে ঢুকলেই চোখে পড়বে ছায়াঘেরা লটকন বাগান। বাগানের অধিকাংশ গাছ গুড়ালি থেকে উপরি অংশের শাখা-প্রশাখায় লটকন ফলে জড়িয়ে আছে। দেখতে মনে হয় যেন পুরো গাছে লটকনের ফুল ফুটছে। বাগানে ঘুরতে ঘুরতে গাছে পাকা লটকন দেখে জীবে জল এসে যেতে পারে।

শিবপুরের চৈতন্যা গ্রামের শামিম মিয়া বলেন, লটকন গাছ সাধারণত বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাসে রোপণের উপযুক্ত সময়। বর্ষার শেষের দিকে অর্থাৎ ভাদ্র-আশ্বিন মাসেও গাছ লাগানো যায়। লটকনের গাছ লাল মাটিতে ঝোপের মতো হয়ে থাকে। প্রতিবছর মাঘ-ফাল্গুনে লটকন গাছে মুকুল আসা শুরু হয়। জ্যৈষ্ঠ মাসের শেষে এ ফল পরিপক্কতা পায়। এটি চাষে তেমন কোনো খরচ নেই। স্ত্রী গাছ লাগিয়ে দিলেই হয়। সময়ে সময়ে একটু পরিচর্যা করতে হয়। গোড়ার চারদিকে জৈব সার দিলে ফলন ভালো হবে। পিঁপড়া বা পোকামাকড়ের হাত থেকে ফল বাঁচাতে ছত্রাকনাশক দিতে হয়।

শিবপুরের কামারগাঁও গ্রামের হাফিজ মিয়া বলেন, এবার অনাবৃষ্টি ও খড়ার কারণে লটকনের ফলন কম হয়েছে। সময় মত পানি না পাওয়ার কারণে লটকনের আকার ও ছোট হয়ে গেছে। তবে ফলন কম হলে ও বাজারে লটকনের ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে।

বেলাব উপজেলার লাখপুর গ্রামের বাগান মালিক মানিক মোল্লা বলেন, লটকন ফল বিক্রির ভাবনা ভাবতে হচ্ছে না তাদের। স্থানীয় বাজার ছাড়াও লটকনের ফল ধরার পর বাগান বিক্রি করে দেওয়া যায়। পাইকাররা বাগান থেকেই লটকন কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। তিনি দুই একর জমিতে লটকন বাগান করেছেন। এ বছর একটি লটকন বাগান ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা এবং আরেকটি বাগান ৩ লাখ ১০ হাজার টাকায় পাইকারদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন।

এদিকে করোনায় শিক্ষিত বেকাররা বাড়িতে বসে না থেকে লটকন চাষ করছে। লটকন চাষ সহজ হওয়ায় ও বাজারের এর ব্যাপক চাহিদা থাকায় তারা লটকন চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তুষার আহমেদ বলেন, করোনার কারণে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। কোন কাজ না থাকায় বাড়িতে বসে অলস সময় পাড় করছিলাম। এবার আর অলস বসে না থেকে বাড়ির খালি জায়গায় লটকন চাষ করেছি। আশানুরুপ ফলন না হলেও আমি আশাবাদী সামনের বছর ভালো কিছু করতে পারবো।

তবে মহামারি করোনাভাইরাসের কারণে দেশে চলমান লকডাউনের ফলে বিক্রির আশঙ্কায় বাগান খরিদ করা পাইকারী ব্যবসায়ীরা অনেক তড়িগড়ি করেই গাছ থেকে লটকন তুলে নেয়। স্থানীয় পাইকারী বাজারগুলোতে ক্রেতার উপস্থিতি নেই বললেই চলে। এছাড়া ঢাকার বিভিন্ন আড়ৎগুলোতে চাহিদা হ্রাস পাওয়ায় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হচ্ছে পাইকারী ব্যবসায়ীরা। ফলে লোকসানের মুখে পড়েছে ব্যবসায়ীরা।

বাগান খরিদ করা পাইকারী ব্যবসায়ী হারিছ মিয়া বলেন, এবছর আমি ধার-দেনা করে ৭ লাখ টাকায় ৩ টি বাগান কিনেছি। শুরুর দিকে ভাল দাম পেলেও বর্তমানে এর অর্ধেক দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ফল নিয়ে ঢাকা নিয়ে যাওয়া যায় কিন্তু ফেরার সময় রাস্তায় অনেক ঝামেলা হয়। এ অবস্থায় হিসাব করলে দেখা যাবে প্রায় তিন থেকে আড়াই লাখ টাকা লোকসান দিতে হবে আমাকে। ধারে টাকা কিভাবে শোধ করবে সেই এখন আমার দু:চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাগান থেকে লটকন কিনতে আসা ফরিদ হোসেন নামে অপর এক ব্যবসায়ী বলেন, শুরু দিকে সাড়ে তিন থেকে চার হাজার টাকা মন ধরে বিক্রি করতে পারলেও বর্তমান লকডাউনের কারণে তা বিক্রি করতে হচ্ছে দুই থেকে আড়াই হাজার টাকায়।

তা তাছাড়া পরিবহন খরচও বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। আগে হকাররা লটকন বিক্রি করতে পারতো। কিন্তু লকডাউনের কারণে তারা বের হতে পারছে না। আমরা লাভ নিয়ে শঙ্কায় আছি।

এদিকে মৌসুমী এ ফলের বেচাকেনাকে ঘিরে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের রায়পুরার মরজাল, বেলাবরের বাড়ৈচা, পলাশের রাবান ও শিবপুর উপজেলা সদরে ও যোশরে বসছে লটকনের পাইকারী বাজার। প্রতিদিন সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন জেলার পাইকারি ক্রেতারা এসে এসব বাজার থেকে কিনে নিয়ে যায় লটকন। পর্যায়ক্রমে হাত বদল হয়ে লটকন যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলার বাজারে। সিলেট থেকে লটকন কিনতে বাড়ৈচা বাজারে এসছেন ফল ব্যবসায়ী অমিত দাস। তিনি বলেন, নরসিংদীর লটকন খুবই সুস্বাধু। বাজারে এর ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। প্রতি বছরই লটকন কিনতে আসি । তাই এবার লটকন কিনতে এসেছি।

বাগানে ফলন দেখছেন ব্যবসায়ী

নরসিংদী কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের কৃষি কর্মকর্তা কিশোর কুমার সাহা বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকলেও কৃষি দ্রব্যাদির যানবাহনে চলাচলে কোন বাধাঁ নেই। আমরা দেশের যেকোন স্থানে লটকন সরবরাহ করতে প্রস্তুত রয়েছি। নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে যাতে সরবরাহ করা যায় তার জন্য আমরা কৃষক ও পাইকারদের কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের একটি স্টিকার প্রদান করা শুরু করেছি। এই স্টিকারটি কোন যানবাহনে লাগানো থাকলে সড়ক- মহাসড়কে তারা কোন হয়রানীর শিকার হবে না।

নরসিংদী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক শোভন কুমার ধর বলেন, লটকন চাষ বৃদ্ধিতে বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে চারা উৎপাদন করা সহ কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশের বাজারে রপ্তানি হওয়াতে কৃষকরা লটকনের ন্যায্য দাম পাচ্ছেন । চলতি মৌসুমে লটকনের মোট উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ২৪ হাজার মেট্রিক টন। যার পাইকারি ৭০ টাকা কেজি দরে বিক্রয় মূল্য দাঁড়ায় ১৬৮ কোটি টাকা।

আর নরসিংদীতে বর্তমানে কোন হিমাগার নেই। যদি হিমাগার থাকতো তাহলে লটকনের বহুমুখী ব্যবহার করা যেত এবং লটকনের মূল্য বৃদ্ধি করা যেতো। আমি সরকারের কাছে জোরদাবি জানাচ্ছি নরসিংদীতে একটি হিমাগার অতি প্রয়োজন। এখানে একটি হিমাগার স্থাপন হলে স্থানীয় ফলের পাশাপাশি বিভিন্ন রকমের সবজী, লেবু সংরক্ষণ করা গেলে কৃষকরা অনেক লাভবান হবার সম্ভবনা থাকে।